Saturday, 20 September 2014

রক্ষনাত্মক নায়ক

এক বলে ছয় রান দরকার। ব্যাটসম্যান জাভেদ ওমর। বোলার বল করলেন। ফুলটস....দেখে শুনে ছেড়ে দিলেন জাভেদ। কোন রান হল নাআআআ!
: জাভেদ ওমরেরর চাকরি হওয়া উচিৎ ডিফেন্সে। কারণ উনি ভালো ডিফেন্স করতে পারেন।
: জাভেদ ক্রিকেটার না হয়ে ফুটবলার হলে কোন পজিশনে খেলতেন?
: নিশ্চয়ই ডিফেন্সে!
এমন অনেক রসিকতাই আমি জাভেদ ওমরকে নিয়ে করেছি, করি। কিন্ত এটাও সত্য যখন বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য থাকতো ৫০ ওভার খেলা তখন জাভেদও ছিলো আমার পছন্দের ব্যাটসম্যান। তখন ক্রিকেট খেলে টাকা আয় করার কথা ভাবে নাই কেউ। ভালোবাসা থেকেই ক্রিকেট খেলতো বুলবুল, আকরাম, আতহার, সুজনরা। জাভেদও তাদের মতই। কালের বিবর্তনে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কাছ থেকে আমাদের চাহিদা বাড়লো। জাভেদও পরিণত হলেন আমার অপছন্দের ব্যাটসম্যানে। শট খেলতে পারে না, হিট করে না, রানও করে না মোট কথা তাকে আর ভালোই লাগে না। বাদ পড়লেন। অবহেলায় অবসরও নিলেন। এত দিন পর আজকে প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরোয়া ক্রিকেট থেকেও অবসর নিলেন জাভেদ ওমর। সেটাও এমনই আনুষ্ঠানিকতা যে, কেউ জানলোই না!
জাভেদ ওমর 'সেই রকম' স্টার নন। তার অবসরে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের ঝড় দূরে থাক, দু এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়ে না। হাজার হাজার মাইল দূরে জ্যাক ক্যালিসরা অবসর নেয়, আমাদের প্রোফাইল পিকচারে আসে তাদের ছবি। জাভেদ ওমরের অবসরে কারও প্রোফাইল পিক বদলায় না। অথচ এই জাভেদ আমাদের দেশেরই মানুষ। চায়ের দোকানে, কোন পত্রিকা অফিসের লিফটে, কাঁচা বাজারে, ঈদের শপিংয়ে হঠাৎই আমাদের সঙ্গে জাভেদদের দেখা হয়। ধাক্কা লাগে। কিন্তু তাদের বিদায় আমাদের স্পর্শ করে না। বহুদূরের ক্যালিস, পন্টিংয়ের বিদায়ে আমাদের চোখে পানি চলে আসে। তারাই যেন আমাদের আপনা লোক। জাভেদ ওমর আমাদের কেউ না।
পুরান বলে যখন আর উইকেট পড়বে না, তখন অধিনায়ক নতুন বল নেবেন এইটাই স্বাভাবিক। জাভেদও হয়তো এখন কোচিং করাবেন নতুনদের। তার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই অনেক নতুন ব্যাটসম্যান হয়তো জাতীয় দলে আসবে। আমি নিশ্চিত, এক বলে ছয় রান দরকার হলে তারা দেখে শুনে ছেড়ে দেবে না, জান দিয়ে ছয় মারার চেষ্টা করবে। তাদের পেছনে তো জাভেদরা ছিলো। জাভেদদের পেছনে কেউ ছিলো না।

_জানুয়ারি ৩, ২০১৪ তে লেখা

Friday, 19 September 2014

দু:খ...

টিভিতে যেদিন জেমসের 'দুখিনী' গানটা প্রথম দেখাইসিলো, সেদিনকার কথা আমার মনে আছে। আম্মা কইসিলো, 'এটা কোন গান হল? গলাও তো ভালো না। এর গান কেন শোন তোমরা?' তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। তুরাগ নদী থেকে অনেক বালু উঠানো হয়েছে। এতদিন পর আজ টিভিতে সেই জেমসের গান শুনে আম্মা বলল, 'বাহ, কত সুন্দর গান।...ইশ, পুরা গানটা দেখাইলো না। কতদিন জেমসের গান শুনি না।' আমি ভালোই অবাক হইলাম। হিন্দী সিরিয়াল হইলে আমার অবাক হওয়া উপলক্ষে নিশ্চিত টানা তিনটা ঠাডার আওয়াজ হইতো। আম্মার এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে জি বাংলা। তাদের 'সারেগামাপা' অনুষ্ঠানে আজকের পর্বে বিচারকদের একজন ছিলেন জেমস। জি বাংলায় যেহেতু জেমস বিচারক, তারমানে সে ভালো, তার গান ভালো, সবই ভালো। জীবন মানে জি বাংলা।
আম্মার মত এমন আরও অনেক মানুষকে আমি দেখসি, যারা এখন জেমসের বিরাট ভক্ত। 'না জানে কোয়ি' গানটা গাওয়ার পর তারা বুঝতে পেরেছেন, জেমস একজন বিশ্বমানের শিল্পী। অথচ তাদেরকেই এক সময় বলতে শুনেছি, 'জেমসের গান তো শুনে বখাটে পোলাপান। তুমি কি বখাটে?', 'জেমসের গান শোন তুমি? খ্যাত নাকি!' আহা, এক হিন্দী গান তাদের পাল্টে দিল। জেমস এখন রেডিসনে কনসার্ট করলে পাবলিক ৫,০০০ টাকা দিয়ে গান শুনতে যাবে। মোবাইলে ভিডিও করতে করতে চিৎকার করে বলবে, 'ভিগি ভিগি রাতেটা গান গুরু।'
শুধু গান না, শাক-সবজি, ফলমূল ছাড়া সর্বক্ষেত্রেই আলগা বিদেশপ্রীতি আমাদের। সাকিব আল হাসান ইভ টিজারকে থাবড় মারলে পাবলিক কয়, 'তুই হালারপুত ব্যাট দিয়া বল মারবি, আরেকজনরে থাবড় মারবি ক্যান? থাবড় মারার লাইগা তোরে ট্যাকা দেয়া হয়?' ওইদিকে সালমান খান কাউরে লাত্থি মারলে মানুষ কয়, 'আরে হ্যায় ইস্টার না, ইস্টাররা এরম দু একটা লাত্থি মারেই। হের লাইগাই তো হেরা ইস্টার।'
হলিউড, বলিউড এমনকি টালিউডের অনেক গাঁজাখুরি, নকল ফিল্ম আমাদের প্রিয় মুভি লিস্টে জায়গা করে নেয়। কিন্তু ঢালিউডের নকল ফিল্ম আমরা মানতে পারি না। আমির খান নকল মুভি বানাইলে সেইটা 'ইনোভেশন', শাকিব খান বানাইলে 'চুরি'। কোলকাতার 'অন্তহীন' হয় আর্ট ফিল্ম, আর ফারুকী নির্মিত 'টেলিভিশন' এর গায়ে জোটে 'এইটা তো ফিল্ম হয় নাই। নাটক বানাইসে হালায় ' লেবেল। 'পাইরেটস অব দি ক্যারিবিয়ান' এর ভুল আমাদের মাথায় ঢোকে না, আমরা মাথা ঘামাই 'ঘেটুপুত্র কমলা'র সিনেমাটোগ্রাফির ভুল নিয়ে। জর্জ ক্লুনি রাজনীতি নিয়া কথা বললে আমরা খুশি হই - 'এই লোকটা একটা মাল। কী সাহসী, স্মাট।' আর আমগো সোহেল রানা রাজনীতি করলে আমাদের গা জ্বলে যায় রাগে - 'হালায় টাকা খাইতে আইসে এই লাইনে। হালারপুত তুই সিনেমা করস, কর। পলিটিক্সে আইবি ক্যান?'
আমরা চাই না আমাদের পাশের বাড়ির, পাশের গলির কিংবা পাশের এলাকার কেউ বড় হোক। এই জন্যই আমাদের 'বড় বড়' লেখকরা হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকে সাহিত্য মনে করেন না। জীবনানন্দকে কবি মনে করেন না। কথায় কথায় শেক্সপিয়ার থেকে ওয়ার্ডসওয়ার্থ, মার্কেজ থেকে পাওলো কোয়েলহো কপচান। 'হুমায়ূন কি মার্কেজের অমুক বইটার মত একটা মাস্টারপিস লিখতে পেরেছে?' আমিও তো একই কথা বলি, 'মার্কেজ কি হুমায়ূন আহমেদের অমুক বইটার মত একটা মাস্টারপিস লিখতে পেরেছেন?
মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, এই বিদেশপ্রিয় মানুষগুলোর কারণেই আমাদের দেশের এই অবস্থা। কয়দিন পর 'বাবু একটা গান কর তো' বললেই পিচ্চি গেয়ে উঠবে, 'বেত্তমিজি দিল জানে না'। কিছু উদারপন্থি লোক তো আছেই, 'সংস্কৃতির কোন দেশ নেই, ভাষা নেই...' এমন বাণী চিরন্তনী দেয়। ওদিকে দোকানে ঝুলে 'জাব তাক হ্যায় জান মেহেদী' কিংবা 'ডোরাকেক'। এই জন্যই তো দেশের এত দু:খ।
আঁধারের সিঁদ কেটে আলোতে এসো
চোখের বোরখা নামিয়ে দেখো জোছনার গালিচা
ঘর ছেড়ে তুমি বাইরে এসো
চেয়ে দেখো রংধনু,
চেয়ে দেখো সাতরং
দুঃখিনী দুঃখ করো না,
দুঃখিনী দুঃখিনী